জাল হাদীছ নির্ণয় করার উপায়
মুহাদ্দিছগণ অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করে জাল হাদীছ নির্ণয় করেন। নিম্নে তা উল্লেখ করা হল :
(১) রাবী নিজেই স্বীকার করেঃ-
উদাহরণঃ-
নূহ ইবনু আবি মারিয়াম। সে ইকরিমা (রহঃ) থেকে ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর নামে কুরআনের ফযীলতে অনেক হাদীছ বর্ণনা করত। যখন তাকে তার বর্ণিত হাদীছগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন সে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে এবং বলে, আমি লোকজনকে দেখছি, তারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং আবু হানীফার ফিক্বহ ও ইবনু ইসহাকের যুদ্ধের কাহিনী বিষয়ক বই পড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এজন্যই আমি কুরআনের ফযীলতে হাদীছ বর্ণনা করি।
-------------------------------------------
(২) রাবী যে সানাদে হাদীছ বর্ণনা করেছেন ঐ সানাদের কোন ব্যক্তি জীবিত থাকলে মুহাদ্দিছগণ তাহক্বীক্বের জন্য সরাসরি তার কাছে যান এবং যাচাই করেন।
-------------------------------------------
(৩) ঐ সানাদের কোন ব্যক্তি জীবিত না থাকলে কয়েকটি বিষয় দেখা হয়ঃ-
(ক) হাদীছ বর্ণনাকারী যে উস্তাদের নাম বলেছেন, সে উস্তাদের সাথে বর্ণনাকারীর কখনো দেখা হয়েছে কি-না তা বিশ্লেষণ করা। এর জন্য ইলমুর রিজালের জ্ঞান থাকা যরূরী। যদি উস্তাদ রাবীর জন্মের আগেই মৃত্যুবরণ করে থাকেন বা দুই জনের জন্মস্থানের মাঝে এত দূরত্ব যে, কারো সাথে কারো দেখা হওয়ার সম্ভাবনাই নেই, তাহলে ধরে নেয়া হবে এই রাবী হয় তার উস্তাদের নাম গোপন করেছেন অথবা মিথ্যা বলেছেন। উভয় অবস্থাতেই হাদীছ অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
(খ) হাদীছ বর্ণনা করার ক্ষেত্রে রাবী একক কি-না তা যাচাই করা। এক্ষেত্রে হাদীছ বর্ণনাকারী যে উস্তাদের নাম বলেছেন, সে উস্তাদের অন্যান্য ছাত্ররা এই জাতীয় হাদীছ বর্ণনা করে কি-না তা যাচাই করা। এই উদ্দেশ্যে মুহাদ্দিছগণ সেই উস্তাদের ছাত্রদের থেকে তথ্য নিয়ে অথবা তাদের হাদীছের সাথে মিলিয়ে নিয়ে সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করেন।
উদাহরণঃ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু ক্বাসিম নামের জনৈক রাবী একদা একটি হাদীছ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আবু হাতেম তাকে শাযান থেকে হাদীছ শুনিয়েছেন, তিনি শু‘বা থেকে, তিনি ক্বাতাদা থেকে, তিনি আনাস (রাঃ) থেকে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আলেমের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে বেশী দামী’। হাদীছ শ্রবণকারী হাদীছটি তার উস্তাদ আবী আলী ইবনু আব্দুর রহীমের নিকট পেশ করলে তিনি বলেন, সে মিথ্যা বলেছে। আবু হাতেম শাযান থেকে কোন হাদীছ বর্ণনা করেন নি।
(গ) হাদীছের শব্দে সাহিত্যের ছাপ না থাকা। একদম নিম্ন পর্যায়ের আরবী ভাষা ব্যবহৃত হওয়া।
(ঘ) পবিত্র কুরআন এবং ছহীহ হাদীছের কোন নিশ্চিত মূলনীতির বিরোধী হওয়া।
(ঙ) রাবীর নিজ মাযহাবের পক্ষে হাদীছ বর্ণনা করা। তথা শী‘আ রাবীর আবুবকর এবং ওমর (রাঃ)-এর বিরোধিতায় রাসূল (ছাঃ)-এর নামে হাদীছ বর্ণনা করা।
এছাড়া আরো অনেক মাধ্যমে মুহাদ্দিছগণ হাদীছের সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করে থাকেন।
-------------------------------------------
নোটঃ- হাদীছ সংকলনের যুগ শেষ। তাই রাসূল (ছাঃ)-এর নামে কেউ মিথ্যা বললে তা নির্ণয় করা কিছুটা হলেও সহজ। হাদীছের যে সমস্ত কিতাব মুহাদ্দিছগণ সংকলন করে গেছেন, তার মধ্যে বর্ণিত হাদীছ যাচাই করা হবে। হাদীছ পেলে সানাদ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। আর না পেলে হাদীছ মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হবে। উল্লেখ্য যে, স্বতন্ত্র হাদীছ গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ, ইতিহাস গ্রন্থসহ বিভিন্ন গ্রন্থে মুহাদ্দিছ ও মুফাসসিরগণ সানাদসহ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
-------------------------------------------
জাল হাদীসের হুকুমঃ- হাদীছ জাল করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। হাদীছ জালকারীর ঠিকানা জাহান্নাম। জাল হাদীছ শরী‘আতের হুকুম প্রণয়নে বিন্দুমাত্র ধর্তব্য নয়, বরং জাল হাদীছ থেকে সতর্ক করা প্রতিটি আলেমের অবশ্য কর্তব্য।