হাদীসশাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি
★ হাদীস মৌলিকভাবেঃ-
১) ক্বাওলীঃ
কোন বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যা বলেছেন, অর্থাৎ যে হাদীসে তাঁর কোন কথা বিবৃত হয়েছে তাকে ক্বওলী (বাণী সম্পর্কিত) হাদীস বলা হয়।
২) ফি'লীঃ
রাসূল (ﷺ)-এর কাজকর্ম, চরিত্র ও আচার-আচরণের ভেতর দিয়েই ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান ও রীতিনীতি পরিস্ফুট হয়েছে। অতএব যে হাদীসে তাঁর কোন কাজের বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে তাকে ফে’লী (কর্ম সম্পর্কিত) হাদীস বলা হয়।
৩) তাক্বরিরীঃ
সাহাবীগণের যে সব কথা বা কাজ নাবী কারীম (ﷺ)-এর অনুমোদন ও সমর্থন প্রাপ্ত হয়েছে, সে ধরনের কোন কথা বা কাজের বিবরণ হতেও শরীয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়। অতএব যে হাদীসে এ ধরনের কোন ঘটনার বা কাজের উল্লেখ পাওয়া যায় তাকে তাকরীরী (সমর্থন মূলক) হাদীস বলে।
-------------------------------------------
★ সনদের শেষপ্রান্ত অনুসারেঃ-
১) মারফুঃ
যে হাদীসের সনদ (বর্ণনা পরম্পরা) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে মারফূ হাদীস বলে।
২) মাওক্বুফঃ
যে হাদীসের বর্ণনা- সূত্র ঊর্ধ্ব দিকে সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে , অর্থাৎ যে সনদ -সূত্রে কোন সাহাবীর কথা বা কাজ বা অনুমোদন বর্ণিত হয়েছে তাকে মাওকূফ হাদীস বলে। এর অপর নাম আসার।
৩) মাক্বতুঃ
যে হাদীসের সনদ কোন তাবেঈ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাকে মাকতূ হাদীস বলা হয়।
-------------------------------------------
★ রাবীর সংখ্যা অনুসারেঃ-
১) খাবরে ওয়াহিদঃ
এটি তিন প্রকার।
(ক) মাশহুর (مشهور): যে কোন স্তরে হাদীস বর্ণনা কারীর সংখ্যা যদি দুই এর অধিক হয়, কিন্তু মুতওয়াতির এর পর্যায়ে পৌঁছে না তাকে মাশহুর (مشهور) বলে।
(খ) আযীয (عزيز): যে কোন স্তরে হাদীস বর্ণনা কারীর সংখ্যা যদি ২ জন হয় ।
(গ) গারীব (غريب): যে কোন স্তরে হাদীস বর্ণনা কারীর সংখ্যা যদি ১ জন হয় ।
২) খাবরে মুতাওয়াতিরঃ
বৃহৎ সংখ্যক রাবীর বর্ণিত হাদীস, মিথ্যার ব্যাপারে যাদের উপর একাট্টা হওয়া অসম্ভব, সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ সংখ্যা বিদ্যমান থাকলে হাদীসকে মুতওয়াতির (متواتر) বলা হয়।
-------------------------------------------
★ গ্রহণযোগ্যতা অনুসারেঃ
(১) মাক্ববুল (গ্রহণযোগ্য):-
(ক) সহীহ লিযাতিহীঃ যে হাদীছ দীনদার ন্যায়পরায়ণ, পূর্ণ স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন রাবী অবিচ্ছিন্ন সানাদে বর্ণনা করেন এবং হাদীছের বিশুদ্ধতাকে বিনষ্টকারী সূক্ষ্ম প্রচ্ছন্ন দোষ-ত্রুটি ও শায থেকে মুক্ত হয়। এরূপ হাদীছকে ছহীহ লিযাতিহী বা সত্ত্বাগতভাবে ছহীহ হাদীছ বলা হয়।
(খ) সহীহ লিগাইরিহীঃ এটি মূলতঃ হাসান লিযাতিহী যখন তা একাধিক সানাদে বর্ণিত হয়।
(গ) হাসান লিযাতিহীঃ যে হাদীছ দীনদার ন্যায়পরায়ণ, হালকা স্মৃতি শক্তিসম্পন্ন রাবী অবিচ্ছিন্ন সানাদে বর্ণনা করেন এবং হাদীছের বিশুদ্ধতাকে বিনষ্টকারী সূক্ষ্ম প্রচ্ছন্ন দোষ-ত্রুটি ও শায থেকে মুক্ত হয়। তাকে হাসান লিযাতিহী বা সত্ত্বাগতভাবে হাসান হাদীছ বলে।
(ঘ) হাসান লিগাইরিহীঃ- এটি মূলতঃ যঈফ, যখন তা একাধিক সানাদে বর্ণিত হয়।
-------------------------------------------
(২) মারদুদ (অগ্রহণযোগ্য):-
(ক) দ্বঈ'ফ/যঈ'ফঃ- যে হাদীসের রাবী কোন হাসান হাদীসের রাবীর গুণসম্পন্ন নন তাকে যঈফ হাদীস বলে।
(খ) মাওদ্বু'/মাওযূঃ- যে হাদীসের রাবী জীবনে কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামে মিথ্যা কথা রটনা করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে, তার বর্ণিত হাদীসকে মাওযূ‘ হাদীস বলে।
-------------------------------------------
মারদুদ (অগ্রহণযোগ্য) হাদীসের হাদীসের প্রকারভেদঃ
★ রাবী পতিত হওয়া অনুসারেঃ-
(১) মু'আল্লাক্বঃ
সনদের ইনকিতা প্রথম দিকে হলে, অর্থাৎ সাহাবীর পর এক বা একাধিক রাবীর নাম বাদ পড়লে তাকে মু’আল্লাক হাদীস বলা হয়।
(২) মুরসালঃ
যে হাদীসের সনদে ইনকিতা শেষের দিকে হয়েছে, অর্থাৎ সাহাবীর নাম বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ সরাসরি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর উল্লেখ করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে মুরসাল হাদীস বলা হয়।
(৩) মুনকাতিঃ
যে হাদীসের সনদে ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নি, মাঝখানে কোন এক স্তরে কোন রাবীর নাম বাদ পড়েছে, তাকে মুনকাতি হাদীস, আর এই বাদ পড়াকে ইনকিতা বলা হয়।
(৪) মুদাল্লাসঃ
যে হাদীসের রাবী নিজের প্রকৃত শাইখের (উস্তাদের) নাম উল্লেখ না করে তার উপরস্থ শাইখের নামে এভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে মনে হয় যে, তিনি নিজেই উপরস্থ শাইখের নিকট তা শুনেছেন অথচ তিনি তাঁর নিকট সেই হাদীস শুনেন নি- সে হাদীসকে মুদাল্লাস হাদীস এবং এইরূপ করাকে ‘তাদ্লীস’ আর যিনি এইরূপ করেন তাকে মুদাল্লিস বলা হয়।
(৫) মু'দালঃ
যে হাদীসে দুই বা ততোধিক রাবী ক্রমান্বয়ে সনদ থেকে বাদ পড়েছে তাকে মু‘দাল হাদীস বলে।
★ রাবীর দোষ প্রমাণিত হওয়া অনুসারেঃ-
(১) মাওদ্বুঃ-
যে হাদীসের রাবী জীবনে কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামে মিথ্যা কথা রটনা করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে, তার বর্ণিত হাদীসকে মাওযূ‘ হাদীস বলে।
(২) মাতরুকঃ-
যে হাদীসের রাবী হাদীসের ক্ষেত্রে নয় বরং সাধারণ কাজে-কর্মে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে বলে খ্যাত, তাঁর বর্ণিত হাদীসকে মাতরুক হাদীস বলা হয়।
(৩) মুনকারঃ
কোন দুর্বল রাবীর বর্ণিত হাদীস অপর কোন মাকবূল (গ্রহণযোগ্য) রাবীর বর্ণিত হাদীসের বিরোধী হলে তাকে মুনকার বলা হয়।
(৪) মু'আল্লালঃ
যে হাদিসের সনদ বা মতনে সূক্ষ্ম ও উহ্য দোষ রয়েছে তাই মুহাদ্দিসদের নিকট মু‘আল্লাল হিসেবে প্রসিদ্ধ”।
(৫) মুদরাজঃ
যে হাদীসের মধ্যে রাবী নিজের অথবা অপরের উক্তিকে অনুপ্রবেশ করিয়েছেন, সে হাদীসকে মুদ্রাজ এবং এইরূপ করাকে ‘ইদরাজ’ বলা হয়।
(৬) মুযতারাবঃ
যে হাদীসের রাবী হাদীসের মতন ও সনদকে বিভিন্ন প্রকারে বর্ণনা করেছেন সে হাদীসকে হাদীসে মুযতারাব বলা হয়। যে পর্যন্ত না এর কোনরূপ সমন্বয় সাধন সম্ভবপর হয়, সে পর্যন্ত এই হাদীসের ব্যাপারে অপেক্ষা করতে হবে অর্থাৎ এই ধরনের রিওয়ায়াত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
(৭) মাক্বলুবঃ
কোনো রাবীর পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সানাদের মধ্যে বা মাতানের মধ্যে কোন পরিবর্তন সৃষ্টি হলে তাকে মাক্বলুব হাদীছ বলা হয়।
(৮) মুছাহ্হাফঃ
ঐ হাদীছকে বলা হয়, যে হাদীছের মধ্যে অক্ষরের নুকতা, হরকত ও সাকিনের পরিবর্তনের কারণে উচ্চারণের ক্ষেত্রে ভুল সংঘটিত হয়।
........
* শায: একাধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর বিপরীতে একজন নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনাকে শায হাদীস বলে।