হাদীছের কিতাবগুলোর প্রকারভেদ
হাদীছের কিতাবগুলো মোট ১২টি ভাগে বিভক্ত।
যেমন :
১. জামে‘
২. সুনান
৩. মুছান্নাফ
৪. মুস্তাদরাক
৫. মুস্তাখরাজ
৬. মুসনাদ
৭. মু‘জাম
৮. যাওয়ায়েদ
৯. জুয
১০. ইলাল
১১. তাখরীজ
১২. আত্বরাফ
নিম্নে প্রত্যেক প্রকারের নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হল :
( ১. জামে‘)-এর সংজ্ঞায় আমরা সহজে বলতে পারি, ইনসাইক্লোপেডিয়া বা বিশ্বকোষ। অর্থাৎ ইসলামের প্রতিটি বিষয়ের আলোচনা যে কিতাবে সন্নিবেশিত থাকে, তাকে জামে‘ গ্রন্থ বলা হয়। ঈমান থেকে শুরু করে ফিক্বহী মাসআলা-মাসায়েলসহ রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী, ইতিহাস, তাফসীর, ক্বিয়ামতের পূর্বে সংঘটিত ফিৎনা-ফাসাদ ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা যে গ্রন্থে করা হয় তাকে জামে‘ বলা হয়। : কুতুবে সিত্তাহ-এর মধ্যে দু’টি গ্রন্থ জামে‘ হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
(১) জামে‘ আল-বুখারী ও (২) জামে‘ আত-তিরমিযী।
(২. সুনান) যে গ্রন্থে হুকুম-আহকাম সংক্রান্ত হাদীছ ফিক্বহী অধ্যায় অনুযায়ী সাজানো হয় সে গ্রন্থকে ‘সুনান’ বলা হয়। ফিক্বহী অধ্যায় অনুযায়ী সাজানো বলতেই আমরা মনে করি, ফিক্বহের বইগুলো যেভাবে সাজানো হয়েছে, সেভাবে সাজানো। কিন্তু এটা ভুল ধারণা। সত্যি বলতে কি ফিক্বহের বইগুলো অস্তিত্বে আসার অনেক আগেই মুহাদ্দিছগণ তাদের বইকে ফিক্বহী অধ্যায় অনুযায়ী সাজিয়েছেন। সুতরাং ফিক্বহী অধ্যায় অনুযায়ী সাজানোর এই ধরণ মুহাদ্দিছগণই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ফিক্বহী বইগুলোর লেখকগণ তাদের নিকট থেকে এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য যে, ফিক্বহী অধ্যায় আকারে সাজানো বইগুলো সাধারণত পবিত্রতার আলোচনা দিয়ে শুরু হয় এবং ক্রয়-বিক্রয় বা হুদূদ বা শিষ্টাচার-এর আলোচনা দিয়ে শেষ হয়। সুনানে আবু দাঊদ, সুনানে নাসাঈ প্রভৃতি।
(৩. মুসান্নাফ) যে গ্রন্থটি ফিক্বহী অধ্যায় আকারে সাজানো হয় তাকে মুছান্নাফ বলে। সুনান ও মুছান্নাফ-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, সুনান গ্রন্থগুলোতে শুধু মারফূ‘ হাদীছ তথা রাসুল (ছাঃ)-এর হাদীছ জমা করা হয়েছে। অন্যদিকে মুছান্নাফ গ্রন্থগুলোতে মাওকূফ ও মাক্বতূ‘ হাদীছ তথা ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবে-তাবেঈগণের ফৎওয়াও জমা করা হয়েছে। মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা।
(৪. মুস্তাদরাক) মুস্তাদরাক শব্দটি ইস্তিদরাক ক্রিয়ামূল থেকে উৎপন্ন। ‘ইস্তিদরাক’-এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, সংস্কার করা, সংশোধন করা। অন্যভাবে বলা যায়, কোন প্লানের অবাস্তবায়িত অংশগুলোকে বাস্তবায়ন করা। পারিভাষিক অর্থে, হাদীছের গ্রন্থগুলোর কোন একজন সংকলক তাদের বইয়ে যে ধরনের হাদীছ সংকলন করতে চেয়েছিলেন, সে ধরনের সকল হাদীছ তিনি জমা করতে পারেননি; বরং তার পরিকল্পনার অনুরূপ আরো অনেক হাদীছ বাকী থেকে গেছে। পরবর্তীতে কোন সংকলক এসে ছুটে যাওয়া হাদীছগুলোকে জমা করেন এবং বইয়ের নাম দেন মুস্তাদরাক। মুস্তাদরাকে হাকেম। অত্র গ্রন্থটি ইমাম হাকেম ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমের ইস্তিদরাক করে লিখেছেন। অর্থাৎ তিনি এই বইয়ে ঐ সমস্ত হাদীছ জমা করেছেন, যেগুলো ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে স্থান পাওয়ার যোগ্য। ইমাম হাকেম তার অত্র বইয়ে অনেক হাদীছকে ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমের শর্তে ছহীহ বলেছেন, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমের শর্তে ছহীহ নয়। পরবর্তীতে ইমাম যাহাবী তার বইয়ের উপর তালখীছ লিখেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত দানের চেষ্টা করেন। কিন্তু তারও অনেক ভুল হয়ে যায়। বর্তমান যুগের মুহাদ্দিছ শায়খ আবু ইসহাক আল-হুয়াইনী উভয় ইমামের সিদ্ধান্তের উপর তাহক্বীক্ব করে এই বিষয়ে ‘ইত্তিহাফুন নাক্বিম’ নামে চমৎকার একটি বই উপহার দিয়েছেন।
(৫. মুস্তাখরাজ) হাদীছের কোন গ্রন্থে বর্ণিত হাদীছগুলোকে মূল সংকলকের সানাদ ছাড়া অন্য সানাদে বর্ণনা করা। ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদীছগুলোকে কোন মুহাদ্দিছ ইমাম বুখারীর সানাদ ছাড়া নিজ সানাদে সংকলন করলে তাকে ‘মুস্তাখরাজ’ বলা হবে। এই জাতীয় গ্রন্থগুলোর ফলে অন্য নতুন সানাদ পাওয়ার কারণে হাদীছ আরো মযবূত হয়। মূল গ্রন্থে হাদীছের কোন ইবারত ছুটে গিয়ে থাকলে অত্র মুস্তাখরাজে তা চলে আসে। মূল গ্রন্থে কোন রাবী তার শায়খ থেকে শ্রবণের বিষয়ে স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার না করে থাকলে অনেক সময় মুস্তাখরাজে স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করে থাকে। এককথায় মূল গ্রন্থে কোন ভুল-ত্রুটি থাকলে মুস্তাখরাজ গ্রন্থে তা স্পষ্ট হয়।
(৬. মুসনাদ ) ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর নামের উপর ভিত্তি করে যে গ্রন্থ সাজানো হয়, তাকে মুসনাদ বলা হয়। তথা সংকলক সর্বপ্রথম আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছগুলো জমা করলেন তারপর আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছগুলো- এভাবে ছাহাবীগণের নাম অনুযায়ী হাদীছ জমা করা হয় মুসনাদ গ্রন্থগুলোতে। ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর সংকলিত মুসনাদে আহমাদ। মুসনাদ গ্রন্থগুলোতে ছাহাবীগণের নাম অনুযায়ী হাদীছ সাজানোর ধরণটা বিভিন্ন রকম হয়। কোন সংকলক ছাহাবীগণের মর্যাদাভেদে তাদের নাম সাজান। যেমন : প্রথমে খোলাফায়ে রাশেদীনের বর্ণিত হাদীছ, তারপর আশারায়ে মুবাশশারা বর্ণিত হাদীছ- এভাবে কিতাবকে সাজান। কোন মুহাদ্দিছ আরবী বর্ণের ক্রমধারা অনুযায়ী ছাহাবীগণের নামকে সাজান।
(৭. মু‘জাম) যে গ্রন্থে উস্তাদগণের নাম অনুযায়ী হাদীছ সাজানো হয়, তাকে মু‘জাম বলা হয়। অর্থাৎ কোন মুহাদ্দিছ তার একেকজন করে শায়খের নাম উল্লেখ করেন এবং তারপর সে শায়খ থেকে যত হাদীছ শুনেছেন সবগুলো বর্ণনা করেন। যেমনঃ ইমাম ত্বাবারানী সংকলিত আল-মু‘জামুল কাবীর।
( ৮. যাওয়ায়েদ) যে গ্রন্থে নির্দিষ্ট কিছু গ্রন্থের তুলনায় অন্য নির্দিষ্ট কিছু গ্রন্থে বর্ণিত অতিরিক্ত হাদীছগুলোকে আলাদা করে জমা করা হয়, তাকে ‘যাওয়ায়েদ’ বল হয়। যেমন কোন গ্রন্থে মুসনাদে আহমাদের ঐ সমস্ত হাদীছকে আলাদা করে জমা করা হল, যেগুলো কুতুবে সিত্তাহতে নেই, তখন এই গ্রন্থকে যাওয়ায়েদ বলা হবে। যেমনঃ ইমাম হায়ছামী প্রণীত মাজমাঊয যাওয়ায়েদ। অত্র বইয়ে তিনি মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে বাযযার, মুসনাদে আবু ইয়া‘লা ও ইমাম ত্বাবারাণীর আল-মু‘জামুল কাবীর, ছগীর ও আওসাত্ব গ্রন্থের ঐ সমস্ত অতিরিক্ত হাদীছ জমা করেছেন, যেগুলো কুতুবে সিত্তাহতে নেই।
( ৯. জুয) যে গ্রন্থে নির্দিষ্ট কোন মাসআলার উপর হাদীছ জমা করা হয়, তাকে জুয বলা হয়। যেমনঃ ইমাম বুখারীর জুযউ রফঈল ইয়াদাইন। অত্র গ্রন্থে তিনি শুধু রফঊল ইয়াদায়ন সম্পর্কিত হাদীছগুলোকে জমা করেছেন।
(১০. ইলাল) যে গ্রন্থে হাদীছের গোপন ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে ইলাল বলা হয়। যেমনঃ ইমাম দারাকুৎনী (রহঃ)-এর লিখিত ইলাল।
(১১. তাখরীজ) বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত সানাদবিহীন হাদীছগুলোর মৌলিক গ্রন্থগুলো থেকে রেফারেন্স দেয়াকে তাখরীজ বলা হয়। যেমনঃ আদ দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদীছিল হিদায়া- হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী।
( ১২. আত্বরাফ) একপ্রকার সূচীপত্র জাতীয় বই। এই জাতীয় বইয়ে সানাদসহ হাদীছের মূল অংশ উল্লেখ করে হাদীছটি কোন্ গ্রন্থের কত খণ্ডের কত পৃষ্ঠায় আছে তা বর্ণনা করা হয়। যেমনঃ তুহফাতুল আশরাফ- ইমাম মিযযী।